আমি এখন মরে গেলে বাঁচি, আল্লাহ আমাকে নেয় না কেন? 2

আমি এখন মরে গেলে বাঁচি, আল্লাহ আমাকে নেয় না কেন?

শাহজাহান বিশ্বাস :
ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে ভিক্ষা করতে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হচ্ছেন রাবেয়া নামের সিনিয়র এ নারী।

তিনি জানেন না করোনা ভাইরাস কি? অভাব আর কষ্টের জীবনে মৃত্যু ভয় তুচ্ছ তার কাছে। তাই দেশের এ করোনা দুর্যোগের মধ্যেও তিনি প্রতিদিন ঘর থেকে বের হন ভিক্ষা করতে।

‘ক্ষুধার জ্বালা বড় জ্বালা’ সওয়া বড় দায়। এ জ্বালা মেটাতে ঘর থেকে বের না হওয়ার আছে কি উপায় ?

প্রাণ ঘাতি করুণার মরণ থাবায় সমগ্র বিশ্বসহ সারা দেশে যখন আতংক বিরাজ করছে। যে মুহুর্তে দিন দিন বাড়ছে মৃত্যু ঝুঁকি।

করোনার সংক্রমন ঠেকাতে মানুষকে ঘরে রাখার জন্য সারা দেশে যখন চলছে অঘোষিত লকডাউন।

সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। নিয়েছে নানা ধরণের পদক্ষেপ।

ঠিক সেই মুহুর্তে ক্ষুধার তাড়নায় আশিরও বেশী বয়সী এই নারী ঘর থেকে বের হয়েছেন ভিক্ষা করতে।

গত কয়েকদিন ধরে আরিচা বাসস্ট্যান্ডের কাছে শিবালয় থানার ওয়ালের পাশে হাত উচু করে বসে থাকতে দেখা যায় ওই নারীকে। রাস্তার পাসে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসে ভিক্ষা করছেন তিনি। যে কোন সময় দুর্ঘটনায় তার জীবন প্রদীপ নিভে যেতে পারে এ ভয়ও নেই তার মধ্যে। তিনি করোনা ভাইরাসের নাম শুনেনি কোন দিন।

সারাটা জীবন করেছেন কষ্ট। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে চান তিনি।

তাই বেঁচে থাকার আশা আর নেই তার। বিধায় মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে প্রতিদিন ঘর থেকে বের হন ভিক্ষা করতে। তার লক্ষ্য একটাই মানুষের কাছে হাত পাতা এবং সাহায্য চাওয়া।

মঙ্গলবার সকালে কথা হয় আরিচা বাসস্ট্যান্ডের কাছে রাস্তার ধারে হাত পেতে বসে থাকা সিনিয়র ওই নারীর সাথে।

তিনি বলেন, দুঃখ আর অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে কেটে গেল সারাটা জীবন। তাই এখন আর বেচেঁ থাকার আশা নেই। আল্লাহ আমাকে নিয়ে গেলেই বাঁচতাম। আমি এখন সকলের কাছে বুঝা হয়ে গেছি। ছেলে সন্তানরা কেউ আর তার কোন খোঁজ খবর নেয় না।

সিনিয়র ওই নারীর নাম রাবিয়া খাতুন, স্বামীর নাম মৃত-গণি হাফেজ। তার বাড়ি ছিল রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার বাবুপড়া গ্রামে। বাড়ি নদীতে ভেঙ্গে গেছে অনেক আগেই।

তিন ছেলে, দুই মেয়ে তার। দুই ছেলে থাকে গোয়ালন্দ এক ছেলে সাভারে। দিন মজুরের কাজ করে তারা। বড় মেয়ে দেশেই বিয়ে দিয়েছি। ছেলেরা পরিচয় দেয় না ও কোন খোঁজ-খবরও নেয় না।

ছোট মেয়ের বিয়ে হয়েছে শিবালয় উপজেলার ছোট বোয়ালী গ্রামে। মেয়ের জামাইয়ের নাম ফরিদ আলী মারা গেছে। লঞ্চের সুপারভাইজার ছিল। তিনি এখন ছোট মেয়ের বাড়িতে থাকেন।

মেয়ের অবস্থাও বেশী ভাল না। তার সন্তান নিয়ে সে নিজেও অনেক কষ্টে আছে। তারপর আবার আমার ঝামেলা। তাই ভিক্ষা না করে করুম কি ?

প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হই দুপুর পর্যন্ত থাকি। চার/পাঁচ বছর ধরে একটা পা ভেঙ্গে গেছে চিকিৎসা করতে পারেনি। লাঠি ভর করে হাটতে অনেক কষ্ট হয়।

এ দুনিয়ার সুখ খাওয়া হয়ে গেছে । আমার আর দুনিয়ার সুখ খাইতে ইচ্ছে করে না। তাই আমি এখন মরে গেলে বাঁচি, আল্লাহ আমাকে নেয় না কেন?

বয়সের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন তার ১শ’ বছর বয়স হয়েছে। বয়স্ক ভাতার কোন কার্ড পাননি। কারো কাছে চাইলে বলে কার্ড দিয়া কি করবা। তুমিতো চাইয়া খাও।

এব্যাপারে শিবালয় মডেল ইউনিয়ন পরিষদের ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, ওই লোকটিকে আমি আজকে (মঙ্গলবার) সকালে ওখানে দেখেছি।

এ বয়সে তার এ অবস্থা খুবই দুঃখজনক। এরকম পরিণতি আর যেন কারো না হয়। সিনিয়র এ নারী যেই হোন না কেন। এমতবস্থায় সার্মথ্যবান সকলেরই তার পাশে এসে দাড়ানো উচিত। আমি আমার সাধ্যানুযায়ী তাকে সহযোগীতা করার চেষ্টা করবো বলে তিনি জানান।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × one =