আজ ১ এপ্রিল লোককবি আব্দুল হাই মাশরেকী’র জন্মবার্ষিকী 2

আজ ১ এপ্রিল লোককবি আব্দুল হাই মাশরেকী’র জন্মবার্ষিকী

মোঃ আজিজুর রহমান ভুঞা বাবুল : কবি আবদুল হাই মাশরেকী ১৯০৯ সালে ১ এপ্রিল, মতান্তরে সার্টিফিকেট (শিক্ষা সনদ অনুযায়ী) অনুযায়ী ১৯১৯ সালে ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার কাঁকনহাটি গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতোই প্রতিবাদী ছিলেন এ লোককবি। ‘ ত্রিশ দশক থেকে শুরু করে একাধারে আশির দশকের শেষভাগ পর্যন্ত লিখে গেলেও তাঁর মৃত্যুর প্রায় তিন যুগেরও বেশি সময় পরও অপ্রকাশিত রয়ে গেছে এ লোককবির অনেক লেখনি।’

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি দেশের এ বিশিষ্ট গীতিকার, সাহিত্যিক, কবি, গবেষক ও সাংবাদিকের।

মাটি ও মানুষের এ লোককবি আব্দুল হাই মাশরেকী ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন একজন সাংবাদিক।

আল্লাাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দেরে তুই-যুগ যুগ ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষস্থানে থাকা এ পল্লীগীতির লেখক কবি আব্দুল হাই মাশরেকী।

শুধু গান নয়, গ্রাম বাংলার জনপ্রিয় পালাগান-রাখাল বন্ধু, জরিনা সুন্দরী, মাঠের গান, ঝিঙে ফুলের লতা, দুখু মিয়ার জারি,হযরত আবু বকর (রাঃ) পুঁথি সাহিত্যেরও লেখক ছিলেন এ কবি।

ত্রিশ দশকের মধ্যভাগ থেকে সত্তরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মাশরেকীর লেখালেখি উভয় বাংলা তথা কলকাতা ও ঢাকার পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হয়।

তার লেখা কবিতা,গান, ছোটগল্প নানা কাগজে প্রকাশিত হয়। দু’টি নাটক ও কিছু অনুবাদকর্মও তিনি করেছেন।বেশকিছু গীতিনাট্যেরও রচয়িতা তিনি।

সে সময়ের মোহাম্মদী, পরিচয়, দিলরুবা, সাওগাত,
মাহে-নও, পূবালী, কৃষিকথা, এলানসহ বিভিন্ন সাময়িকিতে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

আবদুল হাই মাশরেকী শুধু গ্রামীণ বিষয়বস্তু নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করে গণমানুষকে উজ্জীবিত করেননি।

তিনি এ যুগের মানুষকে গণতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত করে তুলেছেন তাঁর রচিত গান দিয়ে-‘এসো গণতন্ত্র গড়ে তুলি/ নতুন দিনের/ এসো করব কায়েম রাজ-কলুষ হীনের…।’ ‘চাষার কুটুম শস্য কণা / মন্ত্রী হইছে অনেক জনা / দু:খের দিনে তাদের দেখা নাই…।’ শহীদদের স্মরণে ‘তারা মরে নাই তারা যে অমর/ নহে গো নহে এ তাদের কবর।’

দেশাত্ববোধক গান- ‘বাংলা মা তোর শ্যামল বরণ / হৃদয় আমার করল হরণ।’ উল্লেখযোগ্য।

তার উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে-‘ এই বীভৎস হানাহনি আর-/এই মৃত্যুকে স্বীকার করিনি কভ‚/মানুষের পথ’,‘শাপদ হিং নখরে বিঁধিছে তবু/তবু তো রক্তে ভিজে গেল রাজপথ’,হে আমার দেশ হৃদয়ের প্রেম দিয়ে তোমাকে তো ভালবাসি হে আমার দেশ’, এই তো পেয়েছি মাকে/বাড়ির সামনে তার নতুন কবর/’বধ্যভ‚মি ঘুরে ঘুরে –।

উপমহাদেশে কবি আবদুল হাই মাশরেকীর লেখা একমাত্র ব্যতিক্রমধর্মী জারি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনভিত্তিক ‘দুখু মিয়ার জারি।’

তিনি লিখেছেন ‘রাখালবন্ধু,’ ‘জরিনা সুন্দরী’ ও ‘কাফনচোরা’র মতো জনপ্রিয় পালাগান।

‘আল্লা মেঘ পানি দে,’ ছায়া দে, ‘মাঝি বাইয়া যাওরে,’ ‘ওপারে তোর বসত বাড়ি,’ এসকল বিখ্যাত গানের স্রষ্টা আবদুল হাই মাশরেকী। কিন্তু কবির বিখ্যাত গানগুলো বেনামে কিংবা সংগ্রহ বলে অবহেলিতভাবে চালিয়ে দিচ্ছে মিডিয়াগুলো।

বাংলা গানের বিশিষ্ট গীতিকার হিসেবে মাশরেকীর নাম স্মরণযোগ্য। যৌবনের প্রারম্ভে তিনি কলকাতার এইচএমভির সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন।

১৯৬৮ সালে ঢাকার গ্রামোফোন কম্পানীর সঙ্গেও গীতিকার হিসেবে তিন বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হন।

ঢাকা বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকার তিনি। তার অসংখ্য গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয় পল্লীগীতি গানের একটি ‘প্রাণ সখীরে, বাবলা বনের ধারে ধারে বাঁশি বাজায় কে-’। তার লেখা ‘ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি’ গানটি তৎকালীন রেডিও সংবাদের আগে ও পরে বাজানো হতো।

১৯৬৭-৬৮ সালে ‘ওরে আমার ঝিলাম নদীর পানি’ বিখ্যাত গানের শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে তাঁকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রীয় ‘তঘমাই ইমতিয়াজ’ পুরস্কার দেয়ার জন্য মনোনীত করে নাম ঘোষণা করলে আবদুল হাই মাশরেকী তাৎক্ষণিক তা প্রত্যাখান করেন।

১৯৫২ সালে রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনে আবদুল হাই মাশরেকী সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন ঢাকা ও ময়মনসিংহে। শহীদদের স্মরণে তার লেখা-‘তারা মরে নাই তারা যে অমর/নহে গো নহে এ তাদের কবর’।

গ্রামীন লোকসাহিত্যের পাশাপাশি তিনি মানুষকে গণতন্ত্রের প্রতি আগ্রহী করতে লিখেছেন-‘ এসো গণতন্ত্র গড়ে তুলি/নতুন দিনের/এসো করব কায়েম রাজ-কলুষ হীনেরসহ অসংখ্য গান।

দেশাত্মবোধক গানের উল্লেখযোগ্য ‘বাংলা মা তোর শ্যামল বরণ/হৃদয় আমার করল হরণ’।ইসলামি গানের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা পায় ‘পড়ি তাসমিয়া পড়ি বিসমিল্লাহ/পড়ি লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’।

১৯৬৭ সালে তৎকালীন সরকারে নির্দেশে কিছুসংখ্যক সাহিত্যিক রবীন্দ্র বিরোধী স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে আবদুল হাই মাশরেকীর কাছে গেলে তিনি স্বাক্ষর না দিয়ে ধীক্কার জানিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন।

কবি আবদুল হাই মাশরেকীর ‘কুলসুম’ গল্পগ্রন্থটি উপমহাদেশের বিখ্যাত অনুবাদক ননী ভৌমিক রুশ ভাষায় রূপান্তর করেন।

তিনি কলকাতায় থাকাকালীন এবং ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় গুরুত্বপূর্ণ পান্ডুলিপিগুলো এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের দেয়া উপহার ‘হারমোনিয়াম’ সেখানে রেখে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে চলে আসেন।

কবি আবদুল হাই মাশরেকী’র বাবা ওসমান গনি সরকার ছিলেন জমিদার বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী আর মা রহিমা খাতুন ছিলেন গৃহিনী।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দত্তপাড়া গ্রামে নিজ বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া কাঁচামাটিয়া নদীকে ঘিরে তাঁর অসংখ্য লেখা রয়েছে।

কবি আব্দুল হাই মাশরেকী পিত্রালয় দত্তপাড়া গ্রাম থেকে প্রাথমিক পাঠ শেষে ঈশ্বরগঞ্জ চরনিখলা মধ্য ইংরেজি স্কুলে, পরে কাঁকনহাটি গামে মাতুলালয়ে থেকে জাটিয়া হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন ১৯৩৯ খ্রীঃ। অত:পর ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেনিতে ভর্তি হয়েও আর্থিক অসচ্চলতার কারণে অকালে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনে ছেদ পড়ে। কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষকতা ও পরে জুট রেগুলেশনে চাকরি করেন।

তিনি দৈনিক সংবাদে সহ-সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে কৃষি মন্ত্রনালয়ের কৃষিকথা পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৭৬ সালে অবসর গ্রহন করেন।

অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার ‘চোর’ গল্প প্রকাশিত হয়। আমাদের সাহিত্যাকাশের নিত্য স্মরণীয় কোন জ্যোতিষ তিনি হতে পারেননি সত্য তবে অনেক তারকার মধ্যে তিনি ছিলেন উজ্জল। লিখেও ছিলেন তিনি কম নয়, কিন্তু প্রকাশিত হয়েছে ক’খানা। জীবদ্দশায় প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো-‘দুখু মিয়ার জারি’ (পল্লিগীতিকা ১৯৬১), ‘কুলসুম’ (ছোটগল্প ১৯৯১),‘বাউল মনের নকশা’ (‘কুলসুম’ এর নামন্তরিত বর্ধিত সংস্করণ ১৯৫৪), ‘সাকো’ (১৯৫৯),‘আকাশ কেন নীল’(অনুবাদ শিশুতোষ বিজ্ঞান ১৯৬২), মাঠের কবিতা মাঠের গান’(কবিতা ১৯৭০), নতুন গাঁয়ের কাহিনী’( নাটক ১৯৭০)।

১৯৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর কবি আব্দুল হাই মাশরেকী সকলকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

মৃত্যুর পর ছেলেদের সহযোগিতায় বেশ কিছু পান্ডুলিপি প্রকাশিত হলেও অনেক পান্ডুলিপি রয়েছে এখনো প্রকাশের বাইরে। এই কবির দুর্লভ বহু পল্লী ও আধুনিক গান, গীতিনাট্য, জারি, কবিতা, গল্প, নাটক ও অনুবাদ তিরিশ দশক থেকে আশি দশকের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। এসব লেখা সংগ্রহ করে দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি ভান্ডারকে আরো সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব আমাদের।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve − eleven =