মানিকগঞ্জে ঘরবন্দি সাধারণ মানুষ : বিপাকে নিম্ন আয়ের লোকজন 2

মানিকগঞ্জে ঘরবন্দি সাধারণ মানুষ : বিপাকে নিম্ন আয়ের লোকজন

শাহজাহান বিশ্বাস :
করোনাভাইরাসের কারণে ঘরবন্দি সাধারণ মানুষ এবং জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে । কাজকর্ম বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশী বিপাকে পরে জেলার নিম্ন আয়ের লোকজন।

বিশেষ করে রিক্সা, ভ্যান, সিএনজি, অটোরিক্সা চালক, গণপরিবহণের শ্রমিক, কুলি, দিনমজুর, চায়ের দোকানদার, হোটেল-রেস্তোরার কর্মচারী, রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি এসব পেশার মানুষ অনেক কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।

এসব লোকজন না পারছে ঘর থেকে বের হতে, না পারছে কাজে যেতে। বাহিরে লোকসোমাগম না থাকায় ঘর থেকে বের হয়েও কোন লাভ হচ্ছে না।
নিম্ন আয়ের লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকার ১০দিনের ছুটি দিয়েছে যার ফলে ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না।

এদের বেশীর ভাগই দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ যাদের সঞ্চয় বলতে কিছু নেই। সংসারে আয়ের অন্য কোন উৎসও নেই।

দশদিনের ছয় দিন আজ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) অতিবাহিত হলো। এখন তো আর ঘরে থাকতে পারছে না বলে তারা জানান। কারণ ঘরে যা ছিল তা শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে রোজগার করতে না পারলে না খেয়ে থাকতে হবে। এখন তারা কোন উপায় না পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন।কিন্ত বাইরে এসে ঠিক মতো কাজ করতে পারছেন না তারা।

বাজারের বেশীরভাগ দোকানপাট বন্ধ, লোকসমাগম নাই বললেই চলে।

এতে ঘর থেকে বের হয়েও আয়ের কোন ব্যবস্থা করতে পারছে না তারা। আবার রয়েছে প্রশাসনের ভয়। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় প্রতিনিয়তই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাদেরকে।

স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি ও নিজেদের নিরাপত্তার কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না মানুষ। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ফুটপাতের দোকান পাট ও চায়ের দোকান।

রাস্তায় জনসমাগম কম থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে রিক্সা ও ভ্যান চালকের আয়। এ অবস্থায় প্রান্তিক ও খেটে খাওয়া দিনমজুর শ্রেণীর মানুষ চরম সংকটের মধ্যে পড়েছেন।

ঋণের কিস্তি বন্ধ থাকলেও পরিবার পরিজনের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের সংস্থান করাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে পরেছে। সংকটকালীন সময়ে জীবন টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সহযোগীতার জন্য খেটে খাওয়া মানুষগুলো সরকারের কাছে জোড় দাবি জানিয়েছেন।

২৫ মার্চ থেকে স্থানীয় প্রশাসন দোকানপাট বন্ধ করে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে না যাওয়ার জন্য মানুষকে আহবান জানায়। এ কারণে বন্ধ হয়ে পড়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যানচলাচল।

সোমবার দুপুরে কথা হয় ছোট আনুলিয়া গ্রামের মিঠু শেখের সাথে। সে আরিচা ঘাটে কুলির কাজ করেন। তার একার আয়ে চলে আট জনের সংসার। সারাদিন বিভিন্ন স্থানে দিনমজুরের কাজ করে আহার জোটে মিঠু শেখ ও তার পরিবারের।

দিনমজুরের কাজ করে প্রতিদিন পেতেন ৫/৭শ’ টকা। তা দিয়ে কোন রকমে দিনযাপন করেন।

কিন্ত করোনাভাইরাস সংক্রামনের পর বিপাকে পড়েছেন তিনি। ২৬ মার্চ থেকে কেউ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না।

সরকার থেকে নিষেধ করায় এই কয়দিন ঘর থেকে বের হয়নি। কিন্ত আজ থাকতে পারলাম না। ৫ দিন পর বাজারে আসলাম।

কিন্ত বাজারে এসে কোন লাভ হলো না। দোকানপাট বন্ধ থাকায় কেউ কোন কাজে নিচ্ছে না। মনে হয় খালি হাতেই বাড়ি যেতে হবে। শুধু মিঠু নয় এরকম দুরবস্থা সকল শ্রমজীবি মানুষের।

ছোট বোয়ালী গ্রামের রিক্স চালক আবেদ আলী জানান, আমার সংসারে চারজন খানেয়ালা। রিক্সা চালিয়ে আয় করা ছাড়া আমার আয়ের আর কোন পথ নেই। শুনছি ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না। ঘরে থাকলে খাব কি ?

সারা দিন রিক্সা চালিয়ে যা পাই তা দিয়ে কোন মতে সংসার চালাই। এখন রাস্তা ঘাটে লোকজন কমে যাওয়াতে ইনকাম বেশী করতে পারছিনা।

পরিবার পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
বড় বোয়ালী গ্রামের ভ্যানচালক বিল্লাল হোসেনের একই কথা। চার দিন পর সে আজ ভ্যান নিয়ে বের হয়েছে। কিন্ত কোন খ্যাপ পায়নি। দোকান-পাট সবকিছু বন্ধ। হাতে যা ছিল সব শেষ। তার ৭জনের সংসার এখন কিভাবে চালাবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে। সরকারী কোন সহযোগীতা জোটেনি এ পর্যন্ত।

আরিচা ঘাটের চায়ের দোকানদার কফিল উদ্দিন বলেন, পাঁচ দিন ধরে দোকান বন্ধ রেখেছি। এই চায়ের দোকানের সামান্য আয় দিয়ে ৮জনের সংসার চালাই। হাতে জমানো টাকা এ কয়দিন বসে বসে খেয়ে শেষ করেছি। আজ দোকানে এসেছি। কিন্ত খোলার সাহস পাচ্ছি না।

এমতাবস্থায় সরকারী কোন সহযোগীতা পেলে আর দোকান খোলার চিন্তা করতাম না।

আরিচা ঘাটে কলা ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান,আমি এ খুদ্র কলার ব্যবসা করে মা-বাবা,ভাই- বোন নিয়ে ১০জনের সংসার চালাই। আমার একার আয় দিয়ে সংসার চলে। চার দিন পর আজ ঘাটে আসলাম। কিন্ত লোকজন বেশী না থাকায় তেমন বেচা-কেনা হচ্ছে না। এ পরিস্থতি অব্যাহত থাকলে সংসার চালানো খুবই কষ্ট হয়ে যাবে।

এছাড়া আরো কয়েকজন দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বললে তারা একই ধরনের কথা বলেন এবং তাদের পরিবারের খাদ্য সংকট নিরসনে সরকারিভাবে সহযোগীতা প্রদানের আনুরোধ করেন।

এব্যাপারে শিবালয় ৩নং মডেল ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকার এসব অসহায় দিনমজুর শ্রেণীর মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেয়া শুরু করেছে। তবে উপজেলা পরিষদ ও প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ এবং দলীয় নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে শ্রেণী ভিত্তিক তালিকা করে ত্রাণ সহায়তা প্রদান করলে পর্যায়ক্রমে সকলেই পাবে বলে তিনি মনে করেন।

তা না হলে সরকারের দেয়া এ সহায়তা একজনে দু/তিনবার করে পাবে আবার অনেকে পাবে না।

এটা তার দীর্ঘ দিনের জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন তিনি।

এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এএফএম ফিরোজ মাহমুদ বলেন, শিবালয় উপজেলায় এ পর্যন্ত ১০ মেট্রিক টন চাল এবং ১লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।

এতে একজনকে ১০ কেজি করে চাল, ডাল, তেল আলু দেয়া হচ্ছে। রিক্সা,ভ্যানচালক, দিনমজুর-শ্রমিক এবং ভিক্ষুক শ্রেণীর মানুষকে অগ্রাধিকারে ভিত্তিতে এসব দেয়া হচ্ছে।

আরো ১০ মেট্রিক টন চাল বিতরণের জন্য প্রক্রিয়াধিন রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা অসহায় লোকদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছি।

এছাড়া প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের দিয়ে তালিকা করানো হচ্ছে। পর্যাক্রমে সকলেই এ খাদ্য সহায়তা পাবেন বলেও জানান তিনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 2 =