জন্মান্ধ মিজানুর যে ভাবে করেন ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা! 2

জন্মান্ধ মিজানুর যে ভাবে করেন ফ্লেক্সিলোডের ব্যবসা!

নাম মিজানুর রহমান। জন্ম থেকে তার দুই চোখই অন্ধ। তার বর্তমান বয়স ২৫ বছর।

কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নের প্রত্যান্ত অঞ্চল টাঙ্গারিপাড়া গ্রামের তার জন্ম।

বাবার নাম মোনতাজ আলী ও মায়ের নাম মোমেনা খাতুন। দুই ভাই বোনের মধ্যে সে বড়। ছোট বোন মরিয়মের বিবাহ দেওয়া হয়েছে।

সে আত্মবিশ্বাস ও প্রবল স্বরণশক্তির মাধ্যমে জন্মান্ধ মিজানুর রহমান ফ্লেক্সি, বিকাশে টাকা লেনদেন করাসহ প্রায় ৫ হাজার মোবাইল ফোন নম্বর মুখস্থ বলতে পারে। ওই এলাকায় অধিকাংশ লোকজন জন্মান্ধ মিজানুরের কাছেই টাকা ফ্লেক্সি করে। মিজানুর চোখে না দেখেই ফ্লেক্সি, বিকাশে টাকা লেনদেন করতে, দেখেন অনেকেই।

আশ্চার্য্য বিষয় হচ্ছে অত্র এলাকার পরিচিত মানুষের সকল মোবাইল নম্বর তার কাছে মুখস্থ। ফ্লেক্সি করতে গেলে নম্বর না বলে ব্যক্তির নাম বললেই টাকা চলে যায় মোবাইলে ফোনে।

দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ায় ইচ্ছা থাকার পরেও পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেনি।

এ দঃখ তাকে ক্ষতবিক্ষত করে। তাই বাধ্য হয়ে টাকা উপার্জনের পথে নামে। কিন্তু শুরুর দিকে তাকে নানা ধরনের অবহেলার শিকার হতে হয়।

কিন্ত শেষ পর্যন্ত মেধা ও স্বরণশক্তি দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে । এখন সে ফ্লেক্সির ব্যবসা করে পরিবারের অর্থ সংকট অনেকটা কমিয়েছে।

মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফ্লেক্সি করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড লাগে অন্ধ মিজানের। দীর্ঘ দিন ধরে এ কাজ করলেও একবারও ভুল করেনি।

মোবাইল নম্বর তার লেখে রাখার প্রয়োজন হয় না। পুরো দিনের হিসাব মুখস্থ থাকে তার।

চোখে না দেখে মোবাইল ফোনে টাকা লেনদেন করা হয় কিভাবে?

এবিষয় জানতে চাইলে মিজানুর রহমান বলেন, কোন বাটুনে কোন সংখ্যা এটা মোবাইল সেটের উপর হাত রেখে বলে দিতে পারি। ব্যবহার করতে করতে আমার সব জানা হয়ে গেছে।

ফ্লেক্সি করার ক্ষেত্রে মোবাইলে কোন বাটুন টিপতে হবে, কোন অপশোনে যেতে হবে-সেটাও আমার জানা হয়ে গেছে।

বর্তমােেন আমি ইউনম্যাক্স, ওয়ালটন ও নোকিয়া কোম্পানীর সেট ব্যবহার করছি। এতে আমার কোন সমস্যা হচ্ছে না।

বিকাশে (ব্র্যাক ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং) বা রকেটে (ডাচবাংলা মোবাইল ব্যাংকিং) টাকা পাঠাতে কোন সমস্যা নেই।

শুধু ইনকামিংয়ের ক্ষেত্রে আমাকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানী হট লাইনে কথা বলে নিশ্চিত অথবা অন্য কারো সহযোগিতা নিতে হয়।

বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী মানবতার মা, জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুল আবেদন আমার অন্ধ দুই চোখের চিকিৎসার সুব্যবস্থা করলে পৃথিবীর আলো দেখতে পাবো এবং অর্থ উপার্জন কওে বৃদ্ধ মা-বাবাকে ভরণপোষনে সহযোগিতা করতে পারবো।

রৌমারী উপজেলার টাপুরচর বাজারে মিজানের দোকানে গিয়ে বিস্তারিত কথা হয় তার সাথে। তখন পার্শ্ববর্তী এক দোকানদার জিয়াদ আহমেদ বলেন, সাধারণ ব্যবসায়ীদের মতোই মিজান কাজ করছে। গ্রাহকদের সঙ্গে টাকা লেন-দেনে কোন ঝামেলার ঘটনা আমি দেখিনি।

ওই দোকানের ঘর মালিক চাঁন মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমি যখন জানতে পারি অন্ধ মিজান টাকা ফ্লেক্সি দিতে পারে।

যেহেতু তার কোন সহায় সম্বল নেই, তখন এই বাজারে আমার একটা দোকানঘর তাকে ভাড়াবিহিন ব্যবসা করার জন্য দিয়েছি। সে যতদিন বেঁচে থাকবে ততো দিন তার কাছে ঘরভাড়া বাবদ কোন টাকা নিবো না।

মিজানের বাবা মোনতাজ আলী বলেন, সে জন্ম থেকেই অন্ধ। চিকিৎসার জন্য তাকে উলিপুর ,রংপুর ও দিনাজপুর চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে গেছি।

চিকিৎসকরা পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তার চোখের অপারেশন করতে চেয়েছিল, কিন্তু অর্থ সংকটের কারনে মিজানের অপারেশন করা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরোও অভিযোগ করে বলেন মেম্বার ও চেয়ারম্যানের কাছে কয়েকবার গিয়েছিলাম তারা আমার ছেলেটাকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোন সাহায্য করেনি। বর্তমানে সে টাকা উপার্জন করে পরিবারকে সাহায্য করবো।

বন্দবেড় ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান কবীর হোসেন জানান, এ বিষয় আমি জানিনা, তবে খোজ খবর নিয়ে আমার পরিষদ থেকে যতটুকু সাহায্য সহযোগতি করার দরকার আমি তা করবো।

উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহমুদা আকতার স্মৃতি বলেন, অন্ধ মিজানুরের বিষয় নিয়ে আমার কাছে কেউ আসেনি। সরেজমিনে গিয়ে সত্যতা পেলে অবশ্যই তাকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, মিজানুর আসলেই জন্মান্ধ, ইতোমধ্যে তাকে প্রতিবন্ধি ভাতার কার্ড করে দেওয়া হয়েছে।

-মাসুদ পারভেজ রুবেল

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 + twelve =