১ হাজার টাকায় ১ কেজি ইলিশ! 2

১ হাজার টাকায় ১ কেজি ইলিশ!

মানিকগঞ্জে প্রশাসনের কঠোর নজরদারীর মধ্য দিয়ে বুধবার দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে মা ইলিশ রক্ষায় একটানা ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ হয়েছে। এসময়ে প্রায় ১৫ কোটি টাকার কারেন্ট জাল জব্দ এবং ৫শ’ ৮জন জেলেকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে।

অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের অভিযান অনেক কাঠোর হয়েছে বলে জানিয়েছেন অসাধু ইলিশ শিকারীরা। এবার অধিক লাভের আশায় নদীতে নেমে মাছ ধরে মওজুত করা সম্ভব হয়নি বলে তারা জানান। ফলে এবছর আরিচা ঘাটের ঐতিহ্যবাহী মাছের আড়তে অভিযানের পরের দিন অনেক কম মাছ উঠেছে। মাছ কম উঠলেও বৃহস্প্রতিবার সকালে আরিচা ঘাটের মাছের আড়তে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়দেখা গেছে। ঢাকা-মানিকগঞ্জসহ আশ-পাশের এলাকা থেকে মাইক্রো, প্রাইভেটকার ও হোন্ডা নিয়ে এসেছে মাছ কিনতে।

১ হাজার টাকায় ১ কেজি ইলিশ! 3
ইলিশসহ অন্যান্য মাছ কিনতে ক্রেতাদের ভিড়। ছবি : প্রতিনিধি

একদিকে মাছের আমদানী কম অপরদিকে ক্রেতাদের ভীরের কারণে মাছের দাম অনেক বেশী । বড় সাইজের ১কেজি ইলিশ মাছ ১হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। যা অন্যান্য বছর অভিযানের পরে দিন বিক্রি হয়েছে ৪/৫শ’ টাকা কেজি। ফলে অনেকেই মাছ কিনতে পারেননি।

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য অফিস সুত্রে জানা গেছে, গত ৯ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর রাত ১২টা পর্যন্ত একটানা ২২দিন নদীতে ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ ছিল। এসময় মাছ ধরার অপরাধে জেলার শিবালয়, হরিরামপুর ও দৌলতপুর এ তিনটি উপজেলার পদ্মা-যমুনা নদীতে অভিযান চালিয়ে মোট ৫শ’ ৮জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩শ ৭জন জেলেকে ১বছর করে কারাদন্ড এবং ২শ’ ১জনকে ৫লাখ ৬৭হাজার ৬শ’ টাকা জরিমানা করা হয়েছে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে। জব্দকৃত মাছের পরিমাণ ৩দশমিক ৫শ’৪৭মেট্রিক টন এবং কারেন্ট জাল ৫২দশমিক ৯২ লাখ মিটার যার মূল্য ১৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। মোট ২শ’ ১৮টি অভিযানের মাধ্যমে ১শ’২৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৩শ’১৯টি মামলা করা হয়েছে। জেলার মোট ১২শ’ ১২টি বিভিন্ন হাটবাজার এবং ৩শ’ ১০টি মাছের আড়ৎ পরিদর্শন করা হয়েছে।

জাতীয় মাছ ইলিশ রক্ষায় প্রজননের এ মৌসুমে বংশ বৃদ্ধির লক্ষ্যে পদ্মা-যমুনায় ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। সরকারী এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য মৎস্য অধিদপ্তর, মানিকগঞ্জ জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, এবং নৌ-পুলিশ ও র‌্যাব সম্বয় রেখে বিষেশ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

জেলা-উপজেলা প্রশাসন এবং নৌ-পুলিশ, জেলা ডিবি পুলিশ ও র‌্যাবের বিশেষ তৎপড়তার কারণে এবছর অভিযান মোটামোটি সফল করা সম্ভব হয়েছে। বিশষ করে জেলার তিনটি উপজেলার মধ্যে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার , সহকারী কমিশনার (ভুমি) এবং মৎস্য বিভাগের ভুমিকা ছিল বেশ লক্ষ্যনীয়। এদের রাত-দিন চব্বিশ ঘন্টা নিরলস প্রচেষ্টায় সবচেয়ে বেশী জেলেকে আটক করে জেল-জরিমানা করা সম্ভব হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ মা ইলিশ ও কারেণ্ট জাল। এদের তৎপড়তায় এবছ অবৈধভাবে মাছের ব্যবসায়ী ও দাদনদার এবং অসাধু জেলেরা নদীতে নামতে পারেনি। তবে যেসব অসাধু জেলেরা নিষেধ অপেক্ষা করে নদীতে নেমেছে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ফলে মা ইলিশ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে এবং ইলিশগুলো নদীতে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে। এতে আগামী দিনে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন অনেকগুণ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ঠরা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করতে অনৈচ্ছুক এক জেলে বলেন, গত বছর নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইলিশ শিকার ও বিক্রি করে ৩লাখ টাকা আয় করেছিলাম। এবারও সে আশায় প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ করে নৌকা ও জাল-দড়ি তৈরি করি। দুইদিন নদীতে নেমে মাছ ধরে ২৫হাজার টাকা বিক্রি করেছিলাম। কিন্ত প্রশাসনের কঠোর অভিযানের কারণে নদীতে আর নামতে সাহস পায়নি।

১ হাজার টাকায় ১ কেজি ইলিশ! 4
ইলিশসহ অন্যান্য মাছ কিনতে ক্রেতাদের ভিড়। ছবি : প্রতিনিধি

অপর এক জেলে বলেন, গত বারের চেয়ে এবার দ্বিগুণ টাকা আয় করার জন্য মোটা অংকের টাকা ব্যয় করে নৌকা ও জাল-দরি তৈরী করে নদীতে নামি। অভিযানের চতুর্থ দিনে প্রশাসনের তাড়া খেয়ে প্রায় ২ লাখ টাকার জাল-দরি নদীতে ফেলে জেল-জরিমানার হাত থেকে পালিয়ে বাচি।

অভিযান সম্পর্কে শিবালয় উপজেলা নিবাহী অফিসার এএফএম ফিরোজ মাহমুদ বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের অভিযান সফল করতে মৎস্য বিভাগসহ সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমাদের উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. মুনিরুজ্জামান বলেন, জেলা-উপজেলা প্রশাসন, র‌্যাব-পুলিশ ও আমাদের মৎস্য অধিদপ্তরসহ সকলের সম্বনিত প্রচেষ্টায় এবারের অভিযান সফল হয়েছে। নদীতে সব সময় কেউ না কেউ থাকছে। যে কারণে অসাধু জেলেরা এবার মাছ ধরার সুযোগ পায়নি। ফলে অধিকাংশ ডিমওয়ালা মা ইলিশগুলো নদীতে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে। এতে আগামীতে আমাদের দেশে ইলিশের উৎপাদন অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি জানান।

শাহজাহান বিশ্বাস/মানিকগঞ্জ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 2 =