জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

বছরজুড়ে আলোচনায় `জকসু ও ছাত্রলীগ’

দেশের অন্যতম প্রাচীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা সংকট এবং সমস্যার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠটি। এসব সংকট থেকে উত্তরনের জন্য প্রতিবছর নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের লড়াকু শিক্ষার্থীরা। তাদের অধিকার আদায়ের জন্য প্রতিবছর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নামেন তারা। চলতি বছরেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

বছরজুড়ে নানান ইস্যুতে আন্দোলন সংগ্রামে উত্তাল ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়টি।

এসব আন্দোলনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিলো বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেতিবাচক কর্মকান্ড, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু) নির্বাচন এবং কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট জমি হস্তান্তর। এছাড়াও বিভিন্ন ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা আলোচিত হয়েছিল ।

ছাত্রলীগের সাংঘর্ষিক ফেব্রুয়ারী:

চলতি বছর (২০১৯) এর শুরুতেই জানুয়ারীর ৩১ তারিখে আলোচনায় এসেছিল ছাত্রলীগের আন্ত:কোন্দলের জেরে প্রেম ঘটিত কারণে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দুই দলের কর্মীদের মধ্যকার সংঘর্ষের ঘটনাটি। এই ঝামেলার ফলে প্রতিনয়ত ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলতে থাকে । এরই প্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আবার দিনভর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের দুগ্রুপের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ কমপক্ষে ৪০ জন আহত হয়। ফলশ্রুতিতে প্রথমে কমিটি স্থগিত করে তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং পরে ১৯ ফ্রেব্রুয়ারী কমিটি বিলুপ্তি ঘোষনা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লড়াই:

জুলাই মাসের শুরুতেই অধিকার আদায়ের জন্য জকসু আইনের খসড়া ছাড়াও ৬ দফা দাবি নিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্ধ। মানববন্ধন শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে স্মারক লিপি প্রদান করেন শিক্ষার্থীরা।

ছাত্রলীগের আনন্দ ও বেদনা মিশ্রিত জুলাই:

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করার প্রায় পাঁচ মাস পর ২০ জুলাই আয়োজন করা হয়েছিল জবি ছাত্রলীগের দ্বিবার্ষিক সম্মেলন। সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী নেতা নাজিবুল্লাহ হিরু, তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা রেজোয়ানুল হক শোভন ও গোলাম রাব্বানী সহ দলের বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বহীনতায় প্রায় তিন ঘন্টা দেরিতে শুরু হওয়া একই কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রায় দুই ঘন্টা বসিয়ে রাখা হয়েছিল । এর প্রভাব ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারন সম্পাদকের অপসারনে পড়ে ।

সম্মেলনে সবচেয়ে বেশী আলোচনা হয়েছিল ৭-৮ ঘণ্টার গরম সহ্য করতে না পেরে ছাত্রলীগ কর্মীদের অসুস্থ হওয়া এবং এসএম ওয়াসির মৃত্যু। তার মৃত্যুতে ছাত্রলীগ পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। ওয়াসীকে নিয়ে অনেক নেতা অনেক আশার কথা শোনালেও সময়ের সাথে সব আশা মিলিয়ে যায়। সম্মেলনে বিভিন্ন সম্ভাব্য প্রার্থীর রঙ্গিন টি-শার্ট পরে ক্যাম্পাসের শোডাউনে অংশ নেন স্কুল পড়ুয়া, সদরঘাটের টোকাই, এলাকার বন্ধু, শ্রমিক, বৃদ্ধ এমনকি রিকশা চালকরাও।

বিলুপ্ত কমিটির ক্ষমতার মোহ:

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদত্যাগের পরে ঐদিনই ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে আনন্দমিছিল করে নিজেদের শক্তি জানান দেয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এর ২ দিন পরে ‘আমরা পুনরায় বহাল’ ঘোষণা দিয়ে এক দিনে বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি’র দোকানদারদের থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে জবি বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি তরিকুল ও সম্পাদক রাসেলের কর্মীরা। চাঁদার টাকা কম দেয়ায় খিচুড়ির পাতিল ছিনতাই ও দোকানীদের পিটিয়েও আহত করেন তারা।

উপাচার্য়ের যুবলীগ প্রেম:

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে “উপাচার্যশীপ ছেড়ে যুবলীগে দায়িত্ব” নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে শিক্ষিত সমাজের কাছে বিষয়টি নিয়ে আলোচিত হয় । এই বক্তব্য প্রত্যাহার করার জন্য দফায় দফায় শিক্ষার্থীরা আল্টিমেটাম দিলেও হার মানেননি উপাচার্য।

স্বপ্নের নতুন ক্যাম্পাস:

চলতি বছরের ১৬ নভেম্বর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেরানীগঞ্জের নতুন ক্যাম্পাসের ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ করা হয়। এরই মধ্যদিয়ে নতুন ক্যাম্পাসের শুভ সুচনা হয় । জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নতুন ক্যাম্পাসের ১৮৮ একর জমিতে ১৩টি হল এবং ৯টি ফ্যাকাল্টি বিল্ডিং সহ উপাচার্য ভবন, রেসিডেন্সিয়াল ও কোষাধ্যক্ষ ভবনসহ পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গঠন করার জন্য যা যা করা দরকার তার সবই করা হবে বলে জানান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান।

ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র প্রনয়ন:

বহুল প্রতিক্ষীত শিক্ষার্থীদের চাওয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যলয় ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র ডাকসুর আদলে তৈরি করা হয়েছে এবং তা মতামতের জন্য গত ২১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসন থেকে জানানো হয়, যে কেউ ৯০ দিনের মধ্যে এই গঠনতন্ত্র পড়ে মতামত দিতে পারবে। প্রাপ্ত মতামত গ্রহণযোগ্য হলে তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিবেচনা করবে। জকসুর গঠনতন্ত্র পরবর্তী একাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটে পাস করে তা অনুমোদনের জন্য জাতীয় সংসদে পাঠানো হবে।

প্রশাসনের উদাসীনতায় ক্যাম্পাসে বহিস্কৃতদের দৌরাত্ম:

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ক্যাম্পাসে বহিস্কৃত ছাত্রদের দ্বারা ছাত্রী শ্লীলতাহানি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের এবং সাংবাদিকদের হুমকি প্রদানের অভিযোগ করলেও কোন পদক্ষেপ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ ও ১৬ তারিখ ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে ২ নারী শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানি করা এবং এক সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া অভিযোগ দিলেও কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় নি। প্রশাসনের উদাসীনতায় বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা অবাধে বিভিন্ন অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে ক্যাম্পাসে।

ছাত্রীহলের কাজ শেষ হয়েও হয় না শেষ!

চলতি বছর জুলাইয়ে কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হলের কাজ শেষ করতে পারেনি শিক্ষামন্ত্রনালয়। আগামী ৩১ ডিসেম্বরের ২০১৯ এর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নির্মাণাধীন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছাত্রী হল বিশ্ববিদ্যালয়কে বুঝিয়ে না দিলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাও করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সরকারি কাজের মেয়াদ ২ বারের বেশি বাড়ানোর সুযোগ না থাকলেও ৪ দফা সময় বাড়ানোর পরও জবির নির্মানাধীন একমাত্র ছাত্রীহলের নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারেনি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) । ২০১১ সালের কাজ শুরু করে থেকে দীর্ঘ ৮ বছরেও কাজ শেষ না হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

সার্বিক বিষয় বিবেচনা করতে গিয়ে জবি ছাত্রলীগ কর্মী রিয়াদ খান বলেন, আমাদের সদ্য বিদায়ী কমিটি ছিলো গোলকধাঁধার মতো। তাই এই সময়ে বিভিন্ন ছোটবড় সংঘর্ষ হয়েছে, যার সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিলো চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে। বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি এমন নেতা আমাদের উপহার দিবেন যাদের নেতৃত্বে এমন কিছুর আর পুনরাবৃত্তি হবেনা।

এছাড়াও সম্মেলন ঘিরে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোর বিষয়েও দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌসিব মাহমুদ সোহান বলেন, ২০১৯ সালটা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বছর ছিল। বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামের সাফল্যের প্রতিফলন দেখা গেছে এই বছরে। আন্দোলনের ফলে দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ ক্যান্টিনের উন্নয়ন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহনের ফলে দীর্ঘদিনের দখলকৃত সেকেন্ড গেট উদ্ধার সম্ভব হয়েছে যা অভাবনীয় সাফল্য। পাশাপাশি জকসুর গঠনতন্ত্রের খসড়া প্রনয়ণ ছিল বড় পাওয়া, যা জকসু নির্বাচনের পথকে আরও সুগম করেছে। আন্দোলনের মাধ্যমে বাসের সংখ্যা বাড়াতে পেরেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এই বছরেই ছাত্রীহল চালুর দাবি থাকলেও সেটা সম্পন্ন না হওয়াটা কতৃপক্ষের। পাশাপাশি ছাত্রলীগের সম্মেলনে ওয়াসী ভাইয়ের মৃত্যু ছিল খুবই বেদনাদায়ক ঘটনা। এদিকে নতুন বছরে সকল ন্যায্য দাবী পূরণ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

২০১৯ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালের সাফলতা ও ব্যার্থতা সম্পর্কে প্রক্টর মোস্তফা কামাল বলেন, ২০১৯ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যলয়ের সবচেয়ে বড় সাফলতা হচ্ছে ১ম সমাবর্তন জানুয়ারীর তারিখ আর কেরানীগঞ্জ এর নতুন ক্যাম্পাস। এবং ব্যার্থতা সম্পর্কে বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে তেমন কোনো ব্যার্থতা নেই। সব কিছু পজিটিভ আছে । জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যলয়কে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আমাদের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা সবাই পরিবারের মত আছি ।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 7 =