নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা 2

নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা

এস আহমেদ ফাহিম : বিশ্ববিদ্যালয় জীবন স্বপ্ন লালনের বাতিঘর । মনের ভিতরে লালিত স্বপ্নগুলোর বীজ যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নতুনভাবে অঙ্কুরিত হয়। আর সেই বীজ বপনের বাহক ও সাক্ষী হয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাস আর সাদা বাস।

বাসগুলো যেন স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, স্বপ্নকে ফেরি করে বেড়ায় সকাল-সন্ধ্যা। তাকে নিয়ে কত অজানা পথিক কত স্বপ্ন বুনে। সেই অজানা পথিকদের মধ্য থেকে উৎকৃষ্টরা স্থান পায় তার বুকে। এই বাসেই জীবনের লক্ষ্যে পৌছানোর স্বপ্নবুনে ভবিষ্যৎ ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাজিস্ট্রেট, অধ্যাপক, ব্যাংকার,গবেষক, বিজ্ঞানী, লেখকসহ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানগুলো।নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা 3

এই বাসের যাত্রী হতে অনেক সাধনা ও তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য প্রমাণিত করতে হয়। তেমনি হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থীতে ভরপুর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) এর শিক্ষার্থীদের কাছে স্বপ্নের ফেরিওয়ালা এখানকার লালবাস-সাদাবাস। সকাল-সন্ধ্যা যখনই সে ছুটে রাজপথে, কত যে উৎসুক চাহনী চেয়ে থাকে তার পানে। সে কত শিক্ষার্থীর আনন্দ-বেদনার সামিল! যাত্রা পথে কত সুর-বেসুরা কণ্ঠ গেয়ে ওঠে গান। ক্লাস শেষে ফেরার পথে সে সরব হয়ে ওঠে গল্প-আড্ডা আর গানে। কোনো গল্প হয় হাসি-খুশির, কোনোটা বা বেদনায় সিক্ত। আর এই হাসি-খুশি আর দুঃখ-বেদনাকে সঙ্গী করেই তার পথচলা।

এই স্বপ্নের ফেরিওয়ালা নিয়ে হাজারো অনুভূতি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ( নোবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের।নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা 4

বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কল্যাণময় চাকমা বলেন, “স্কুল- কলেজের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবেগ ও ভালোবাসার একটি জায়গা এই সাদা বাস, লাল বাস। এই বাস গুলোই অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে পরিচয় ও যোগাযোগের একটি ভালো মাধ্যম৷ এই বাসেই গড়ে ওঠে নতুন বন্ধুত্ব। নবীনদের সুরেলা কন্ঠের গানে এই বাস মুখরিত হয়। এখানে সৃষ্টি হয় ভালোলাগার, ভালোবাসার বন্ধন। আর সেই বন্ধন হয়তো সারাজীবনের জন্য এগিয়ে যায়। ক্লাস শেষে বাস ছুটে চলে তার আপন গতিতে । বাসের ঝাঁকুনির সাথে ক্লান্ত শরীরে কারো ঘুম ভাঙে। কেউ বন্ধুর সাথে গল্প জুড়ে দেয়, কেউ শীতল বাতাসের ছোঁয়া পেতে বাসের গেইটে দাড়িয়ে বাসের হেলপার এর অনুভূতির স্বাদ নেয়৷ এই বাসের অনেক যাত্রীই একদিন ভালো অবস্থানে চলে যায়, দেশের স্বার্থে, দেশের উন্নয়নে আর্তমানবতার সেবায় আত্বনিয়োগ করে৷ ভালো থাকুক আমাদের এই নীলসাদা, লাল রঙের বাস।”

পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন,”মনের ভিতরে লালিত স্বপ্নগুলো যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তার বীজ বুঝি অঙ্কুরিত হয়। আর সেই বীজ বপনের বাহক যেন হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাল বাস আর সাদা বাস।

লাল বাসের দোতলায় বন্ধুদের সাথে বসে গলা ছেড়ে গান আর আড্ডাবাজি যেন আঁকাবাঁকা রাস্তার সাথে অদ্ভুত ভাবে ঢেউ খেলে চলে লাল বাস। মনের ভিতরে অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করে রাস্তায় দুইপাশের গাছপালা আর ১০১ একরের পথটা। সাদা বাস লাল বাস প্রতিদিন প্রতিনিয়ত নিজের কাঁধে চেপে বয়ে বেড়ায় হাজারো স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীকে। এই লাল বাস ও সাদা বাসের প্রতিটা সিটে যেন প্রতিদিন নতুনত্বের জন্ম হয়। শুরু হয় নতুন কোনো প্রনয়ের সুর কিংবা বিচ্ছেদ এর গল্প, শুরু হয় বন্ধুত্ব কিংবা মিষ্টি মিষ্টি ঝগড়া।প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয় কোনো সিনিয়র বা জুনিয়র নিয়ে আবার পরক্ষণে মিলিয়ে যায় র‍্যাগিং বা বেয়াদবির কোনো অধ্যায়, কেউ কেউ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত, কেউবা বন্ধুদের নিয়ে। এইভাবে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত বাসগুলো নোবিপ্রবির ১০১ একর থেকে হাজারো গল্প নিয়ে বের হয় আবার হাজারো গল্প নিয়ে ১০১ একরের নোবিপ্রবি নামক স্বপ্নভূমিতে প্রবেশ করে।”

বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী নুবায়রা হাফিজ বলেন,”আমার খুব ইচ্ছে ছিলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার এবং আমার এই ইচ্ছার পিছনে অনুপ্রেরণা ছিলো নোবিপ্রবির বাস গুলো। আগে স্কুলে যাওয়ার সময় যখন দেখতাম নোবিপ্রবির সাদা এবং লাল বাস গুলো নোয়াখালীর শহরের বুকে চলাচল করে, তখন ভাবতাম এই বাসে কারা উঠতে পারবে? আর কিসের বাস এগুলো? বাসে উঠতে হলে কি টাকা নেয়? পরে বুঝলাম এই বাসে উঠতে হলে সবার এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্যতা নিয়ে চান্স পেতে হয়। আব্বুর সাথে বাইরে বের হলে আব্বু এই বাস গুলো দেখে বলতেন, “ইনশাআল্লাহ তুমিও এই বাসে উঠবা। ভালো করে লেখাপড়া করো।

বাসের জানালা দিয়ে মুখ গুলো দেখতাম। কারো মুখে ক্লান্তি, কারো বিষাদে পূর্ণ । আর দেখতাম কিছু ঘুমন্ত মুখ। খুব ইচ্ছে ছিলো এই সাদা নীল আর লাল দোতালা বাসে উঠার। লাল বাস গুলো দেখলে অবাক হতাম ছোটকালে। ভাবতাম বাসের উপর সিড়ি কিভাবে? এত বড় কীভাবে হয় বাস গুলো! তাই কৌতুহল ছিলো। স্বপ্ন ছিল এই বাস গুলো তে করে পুরো শহর টাকে আবার নতুন করে দেখবো।

অবশেষে ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি আমার এই স্বপ্ন পূরন হলো।সেইদিন নোবিপ্রবি তে আমার প্রথম ক্লাস ছিলো। ৯ টার লাল দ্বিতল বাসে করে প্রথম ক্লাস করতে গেলাম। প্রথম দিন আব্বু দিয়ে আসছিলো আমার বাসে করে ভার্সেটি যাওয়া দেখতে। যখন ঘড়িতে ৯টা বাজলো,বাস চলতে শুরু করলো। আমি বসছিলাম বাসের উপরের তলায়।জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম আর দেখলাম সব উঁচু উঁচু লাগে। যেন নতুন কোথাও আসছি। নোবিপ্রবিয়ান হয়ে এই বাসে উঠা ছিলো আমার অন্যরকম প্রাপ্তি।সাদা নীল বাস গুলো দেখলে মনে হয় পুরো আকাশ মাটিতে নেমে এসেছে। এই বাস গুলোতে সবাই খুব স্বপ্ন আর আশা নিয়ে উঠে। বেঁচে থাকুক এই স্বপ্ন গুলো।ভালোবাসি এই অনুভূতি গুলোকে।”

অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অনন্যা মজুমদার বলেন,বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে চড়ার অনুভূতি অন্যরকম।অন্য বাসে চড়ার চেয়ে এবাসে চড়তে ভালো লাগা,আত্মতৃপ্তি কাজ করে।যখন প্রথম বর্ষে ভর্তি হলাম এখানে,ক্যাম্পাস থেকে যাওয়া ও আসার সময় সবাই মিলে গলা ছেড়ে গান ধরতো, কতো আড্ডা, গল্প, খুনসুটি এই বাস এর মধ্যে।বাসগুলো যখন অন্য গাড়িকে অতিক্রম করে স্বগৌরবে সামনে এগিয়ে চলে তখন মনের অজান্তেই অসাধারণ শীতল বাতাস এসে তৃপ্তির পরশ বুলিয়ে যায়।আমাদের প্রতিদিনকার মুহুর্তগুলোর সাক্ষী হয়ে বাসগুলো এগিয়ে চলে তার গন্তব্যে।”

অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ রিজুয়ান ফাহিম বলেন,
সাদা বাস আর লাল বাস,আমাদের প্রতিদিনকার নিয়মমাফিক যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। এ বাসগুলো আমাদের জীবনের অংশই বলা চলে। সুখ-দুঃখ, হাসি-বেদনা, তাড়াহুড়ো কিংবা স্থবিরতা সব কিছুর নীরব সাক্ষী যে এ বাসগুলো। ক্লাসের শেষে বাসে সীট রাখার দৌড়-ঝাপ কিংবা সিট না পেয়ে দরজায় ভিড় করা। অতঃপর চলতিপথে পরিচিত-অপরিচিত, ছোট-বড় সকলের সাথে সমস্বরে গান গাওয়া কিংবা দোতলা বাসের জানালায় হালকা মাথা বের বাতাসের কাছে নিজের যাতনা গুলো বিলিয়ে দেওয়া তো আমাদের প্রতিদিনকার কর্ম, যা আমাদের অনুভূতির অংশই হয়ে গেছে।”

এরকম হাজারো নোবিপ্রবিয়ানের আবেগের জায়গা, ভালোলাগা এই লালবাস-সাদাবাস।এই বাস ঘিরেই নোবিপ্রবিয়ানদের হাজারো স্মৃতি, হাজারো গল্প। স্বপ্নবাজ তরুণদের নিয়ে প্রাণ ফিরে পায় এই যানবাহনগুলো।করোনার ছুটিতে বাসগুলো তার প্রিয়মুখগুলোর ফিরে আসার অপেক্ষার প্রহর গুনছে।অপেক্ষার প্রহরের অবসান ঘটিয়ে বাসের সকল যাত্রী তার স্বপ্নভূমিতে ফিরবে।

সাদা, লাল বাস আবার তার আপন গতি ও প্রাণ ফিরে পাবে৷তৈরি হবে নতুন গল্প,এমনটাই প্রত্যাশা শিক্ষার্থীদের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ten + two =